নির্দেশ ঃ নিম্নে প্রদত্ত গদ্যাংশটি পড়ুন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলির (91 থেকে 99 নং প্রশ্ন) সঠিক উত্তর নির্বাচন করুন।
নেপোলিয়নের ছবির নিচে নবেন্দু জোড় হাতে দাঁড়িয়ে থাকে এক মিনিট। সেকেণ্ডের কম-বেশি হবার জো নেই। ছুটন্ত ছোট কাঁটা টুক্ টুক্ করে পার হয়ে যায় ষাট ঘর। ব্যস্, এবার শুরু দিনের কাজ। এই ইতিহাস প্রসিদ্ধ প্রবাদ পুরুষটির একটা কথা তার কাছে নয়া বেদের দোসর। অসম্ভব শব্দটা লেখা আছে বোকার অভিধানে —নবেন্দুর কাছে এ বাণী হীরে জহরতের চেয়ে অনেক দামী। অসম্ভব বলে কিছু আছে, সে বিশ্বাস করতে নারাজ।
নিজের পায়ের ওপর খাড়া থাকতে সে ভালবাসে, লাঠির ওপর তার গভীর অনীহা। মাটির পৃথিবীতে চোখ মেলে বুঝেছিল, পৃথিবী বড় বৈরীভাবাপন্ন। এখানে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গেলে লড়াই করতে হবে। সংগ্রাম বিনা কোন কিছু ধরা যাবে না হাতের মুঠোয়।
নবেন্দু যুদ্ধ-জেতা সৈনিক। দূর থেকে তার বাড়ির দিকে তাকালে, মন ভরে যাবে গভীর আবেশে। ছোট ছিমছাম দোতলা বাড়ি। বাড়ির ছাদে অ্যান্টেনার রুপোলি পাখনার বাহার; গ্যারাজে নতুন মডেলের ঝক্ঝকে গাড়ি। বাড়ির মধ্যে ফ্রিজ স্টিরিও। ঘরে ঘরে এয়ার কুলার। রাস্তার ছেলে নবেন্দু, সিঁড়ি বেয়ে, মন্থর কিন্তু দৃঢ় গতিচ্ছন্দে, ওপরে উঠে এসেছে ধীরে ধীরে। কোন বাধা চলার পথে সৃষ্টি করতে পারে নি ব্যারিকেড।
সব হয়েছে, আরো কিছু হবে। কিন্তু একটা বিষয়ে কিছু পিছিয়ে পড়েছে। ঘাটতিপড়া অংশটুকু পূরণ করার কোন আশা নেই। সেটা নবেন্দুর জীবনে সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে। লেখাপড়া করে উঠতে পারে নি। ম্যাট্রিকের দরজা গোড়া থেকে ফিরে এসেছে। সেজন্যে পড়াশোনা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায় সযত্নে। তাহলেও এ ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। মেয়ে কণি পড়ে লরেটোয়, ছেলে রিন্টু পড়ে সেন্ট টমাসে। বাড়ির পরিবেশে সাহেবিয়ানার ছাপ। দ্বারভাঙা বিল্ডিং-এর থাম দেখে ফিরে এলেও নবেন্দু ইংরিজি ভাষায় কম দুরস্ত নয়। অনর্গল ইংরিজি বলে যেতে পারে, কোথাও ভুলভ্রান্তি থাকলে তা নেহাত গ্রামারের অপরাধ। কাবেরী তার আওতায় পড়ে না। তাকে গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করবার চেষ্টা সে করে নি, তা নয়। তবে নবেন্দুর বিবেচনায়, কাবেরী রাসভকুলে নিম্নশ্রেণীভুক্ত, আশা নেই রূপান্তরের।
লনে পা দিয়েই নবেন্দু অবাক। নেড়ি কুত্তার একটা কালো কালো নাদুস্নুদুস্ বাচ্চা যদৃচ্ছ বিচরণে ব্যস্ত। বাচ্চাটার গায়ের লোম পালোয়ানী ছাঁটের নয়, বর্ষার জল-পাওয়া ঘাসের মত নধর চিকন, কিছু-বা দীঘল। চোখ দুটোর চারধারে গোলাকার সাদা বৃত্ত। যেন দুধ সাদা গো-গো রয়েছে চোখে।
নিঃসন্দেহে রাস্তার কুকুর। গেটের তলা দিয়ে গলে ঢুকে পড়েছে লনে। হাই-হুই করে তাড়া দেয়। ঘুরে-ঘুরে পায়ে কুকুর বাচ্চা এগিয়ে আসে তার দিকে। তার পায়ের কাছে এসে চটি চাটতে শুরু করে। পা ছুঁড়ে দূরে তাড়াবার চেষ্টা করে। একটু সরে যায়, আবার নির্ভয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসে।
সকালে মেজাজ বিগড়ে যায়। কোথাকার আপদ এসে জুটল! নেড়ি কুত্তার বাচ্চা ঘরে ঢুকে পড়বে নাকি ? সে ওর গায়ে হাত দিতে পারে না। কোথাকার কোন্ ডাস্টবিনের ধারে পড়ে থাকে কে জানে। গায়ে ক’টন জীবাণু আছে তার হিসেব রাখে কে ?
—পরেশ!
কড়া গলার ডাক শুনে চাকর পরেশ হামেহাল হাজির হয়। কুকুরের দিকে তর্জনী তুলে নবেন্দু জিজ্ঞেস করে—কোথা থেকে এলো ?
—ও তো সিজার।
—হোয়াট ?—নবেন্দুর কপালের চামড়ায় দেখা দেয় অনেক বলিরেখা।
—আজ্ঞে ?
—সিজার কে ?
—কুকুর।
—ননসেন্স! সিজার কুকুর!
—খোকাবাবুর কুকুর।